সারা সপ্তাহ অফিস, সন্তানের স্কুল সামলে উইকএন্ড টুকু পাওয়া যায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর। তাই সপ্তাহশেষে অনেকেই মুখিয়ে থাকেন একটা ছোট্ট ভ্রমণের জন্য। শহর ছেড়ে বেরিয়ে শান্তির খোঁজে এদিক-ওদিক যান। কখনও গঙ্গার পাড় ধরে এগিয়ে যাওয়া, আবার কখনও ডেস্টিনেশন হাইওয়ের কোনও ধাবা। কিন্তু এই উইকএন্ডে যেতে পারেন ইতিহাসের খোঁজে। কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে খুব বেশি দূরত্বে যেতে হবে না। হুগলিতেই রয়েছে আভিজাত্য আর বাংলার ইতিহাসে মোড়া ইটাচুনা রাজবাড়ি।
বর্তমানে বাংলার বিভিন্ন রাজবাড়ি, জমিদার বাড়ি হয়ে উঠেছে উইকএন্ড ডেস্টিনেশন। যে সব জায়গা একসময় প্রজাদের ধরা ছোঁয়ায় বাইরে ছিল, আবার এক সময় ভগ্নপ্রায় দশায় পড়েছিল, সেই কয়েকশো বছরের পুরনো বাড়িগুলোতে এখন চাইলেই আপনি রাত কাটাতে পারবেন। তেমনই একটি জায়গা হল ইটাচুনা রাজবাড়ি।
স্থানীয়রা বলে বর্গীডাঙা। এই ‘বর্গীডাঙা’র সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ইটাচুনা রাজবাড়ির ইতিহাস। এই ইতিহাস সেই সময়ের যখন ‘বর্গী এল দেশে’। চৌথ আদায়ের জন্য মরাঠা থেকে বর্গীর দল বারবার বাংলা আক্রমণ করত। ধনসম্পত্তি আদায় করে আবার ফিরে যেত নিজ দেশে। তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ আর ফেরেনি। তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে এই বঙ্গদেশে। তারই একটি উদাহরণ হল ইটাচুনা রাজবাড়ি। ইটাচুনা রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কুন্দ্রারা। এই কুন্দ্রা থেকেই কুণ্ডু এসেছে। সবচেয়ে সাফল্য শাসনকর্তা ছিল নারায়ণ কুণ্ডু। তাঁরই বংশধররা ১৭৬৬ সালে এই রাজবাড়ি তৈরি করেন। রাজবাড়ি তৈরির মূল উপাদান ইট ও চুন, তাই তার নামও হল ইটাচুনা রাজবাড়ি। আর বর্গীডাঙার নাম হোলো ইটাচুনা। ইটাচুনা গ্রামে পৌছানো যায় হাওড়া বর্ধমান মেন লাইনের লোকাল ট্রেনে। স্টপেজ খন্যান ষ্টেশন। সেখান থেকে মিনিট দশেক অটো বা টোটোতে।
জমিদারী প্রথা কবেই বিলুপ্ত, আজকাল জমিদার ও রাজবাড়ীগুলো অধিকাংশই তত্ত্বাবধানের অভাবে বিলুপ্তির পথে। কিন্তু নারায়ণ কুণ্ডুর চোদ্দোতম বংশধর ধ্রুব নারায়ণ কুণ্ডু রাজবাড়ীর নিয়মিত সংস্কার জারি রেখেছেন এবং ব্যবসায়িকভাবে এটি ব্যবহার করে টিকিয়ে রেখেছেন রাজবাড়ীর রূপ ও ঐতিহ্য।
উঁচু কড়িবরগার ছাদ, প্রাচীন দেওয়াল, আল্পনা দেওয়া বিরাট নাটমন্দির, বড়-বড় ঝাড়বাতি আর দালানজুড়ে বিরাট-বিরাট বাতিস্তম্ভ দিয়ে সাজানো গোটা রাজবাড়ি। এখানেই শুটিং হয়েছিল সোনাক্ষী সিনহা ও রণবীর সিংহ অভিনীত ‘লুটেরা’ সিনেমার দৃশ্য। এছাড়া বেশ কিছু সিনেমা ও অজস্র বিজ্ঞাপনী ছবির শুটিং হয়েছে এখানে। আপাতত এটি একটি হেরিটেজ হোটেল। ইটাচুনার রাজবাড়ী এখন হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকের ইটাচুনা খন্যান গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে।
কলকাতা থেকে ৯০ কিমি দূরে অবস্থিত ইটাচুনার রাজবাড়ী গঠনগত দিক দিয়ে সাবেকী জমিদার বাড়ীর স্বাদ এনে দেয়। বিশাল লোহার গেট পার হলেই চোখে পড়বে ইংরাজীর ‘ইউ(U)’ আকৃতির প্রকাণ্ড দোতলা রাজবাড়ী। এই বাড়ির আনাচে-কানাচে লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাস। দুটো অংশে বিভক্ত বাড়িটা। বাইরের মহলে রয়েছে কাছারি বাড়ি, হিসাবের ঘর ইত্যাদি। এগুলো পেরিয়ে পৌঁছতে হয় অন্দরমহলে। অন্দরমহলের জানলা ছোট ছোট। ভিতরে বসে বাইরের দৃশ্য দেখা গেলেও, বাইরে থেকে ভিতরে উঁকি দেওয়া কঠিন। বাড়ির মেয়েদের কথা ভেবে এভাবেই তৈরি ইটাচুনা রাজবাড়ি।
বাড়ীটি একটি উঠানকে ঘিরে নানা মহলে বিভক্ত । ঢুকেই বিশাল সবুজ চত্বর, তার পরের উঠানে রয়েছে নাটমন্দির, তারও পরে অন্দরমহল। একেবারে পেছনে খিড়কি পুকুর। ইটঁ আর চুন সুরকির তৈরী এই স্থাপত্য তার গরিমা প্রকাশ করে উচুঁ উচুঁ ধাপের সিঁড়ি, চারদিকে বিশাল চকমেলানো বারান্দা, প্রকাণ্ড আয়তনের ঘর,
খড়খড়ির জানলা, প্রাচীন আসবাব, দেওয়ালে হরিণের শিং, কচ্ছপের খোলস দিয়ে তৈরী যুদ্ধের ঢাল, বারান্দার গোল থাম আর খিলানের ফাঁক দিয়ে আসা ঝিকিমিকি রোদ্দুরে। সাবেকিয়ানার ছাপ সর্বত্র। তিনমহলা রাজবাড়ীর বহির্মহলে অফিস অর্থাৎ সেরেস্তার কাজকর্ম হতো। এক সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অফিসও ছিল। প্রবেশপথের খিলানের উপর লেখা শ্রীমদভাগবতগীতার বাণী
“পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম পিতাহি পরমং তপ
পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা ”।
এর ঠিক উপরে লেখা ‘১৮৯৪ সালে শ্রী নারায়ণ কুণ্ডু মহাশয় কতৃক পুনঃসংস্কৃত। এই প্রবেশপথের দোতলায় জোড়া গোলাকৃতি থামের উপর ছোট ছোট দুটি কারুকার্য মন্ডিত সাদা খিলান, তার উপর বড় একটি খিলান। সবটাই ফুল লতাপাতায় নকশা করা, তার উপরে এই রাজবাড়ীর প্রতিষ্ঠার কথা লেখা- “১৭৬৬ সালে সাফল্য রায় কুণ্ডু মহাশয় কতৃক স্থাপিত”। সবার উপরে কুলদেবতার আশীর্বাদ প্রার্থনা “শ্রী শ্রী শ্রীধর জিউ কৃপাহিকেবলম”।
প্রাসাদের মাঝের অংশে ঠাকুরদালান। প্রশস্ত দালানের দুধারে সার দিয়ে সুন্দর শিল্পিত বাতিস্তম্ভ,মেঝেয় আলপনা। মন্দিরে নারায়ণ বিগ্রহ আছে শ্রীধর জিউ রূপে। বিগ্রহ যেখানে অধিষ্ঠিত তার সামনে গোলাকৃতি
বারান্দা, তাকে ধরে রেখেছে তিনটি থাম। থামগুলি আবার ছোট ছোট থাম সংলগ্ন করে তৈরী। সুন্দর তিনটি খিলান বা আর্চ দিয়ে ধরে রাখা আছে বারান্দার এই গোলাকৃতি অংশটি।খিলানের মাথায় সমাজচিত্রর ছবি প্লাস্টারে ফুটিয়ে তোলা আছে। অন্দরমহলে রয়েছে বড় বারান্দা,সিঁড়ি আর ছাত যা দিয়ে অন্দরমহলের সব ঘরগুলিই সংযুক্ত। এক মহল থেকে অন্য মহলে যাতায়াত রীতিমত গোলকধাঁধার মতো। বারান্দার মাথায় চোখে পড়ে টালির ছাউনি। আর নানা তলে বিভক্ত ছাদে উঠলে বোঝা যায় এই বাড়ির বিশালত্ব।
শুধু রাজবাড়ীর ভিতরে নয়, রাস্তার অপর পাড়েও রয়েছে রাজবাড়ীর প্রতিষ্ঠিত শিব মন্দির। এই মন্দিরে শিবের মুর্তির বিশেষত্ব নজর কাড়ে। কথিত আছে এই বংশের একজন বিহারে ইংরেজ আমলে ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরী করতেন। সেখানে উনি এই বিগ্রহটি পান এবং ইটাচুনায় প্রতিষ্ঠা করেন। এই শিবমূর্তিটি জটাধারী, গোঁফওয়ালা কোন এক যোগী পুরুষ যেন বসে আছে। এধরনের মূর্তি সাধারণত কোথাও দেখা যায় না।
শোনা যায় এই শিবের পুজো শুরু হবার পরেই কুণ্ডু বংশে কিছু দুর্ঘটনা ঘটে, ফলে তাঁরা আর এই মূর্তির পূজা করেন না, গ্রামবাসীরাই নিত্যপূজা চালান। মন্দিরের আকৃতিও একটু বিশেষ ধরনের। ভিতরের দিকে গোলাকৃতি। সামনে গথিক আর্চ দিয়ে তৈরী বারান্দা, মন্দির চূড়ায় বিভিন্ন খাঁজকাটা। সামনে প্রাঙ্গণে রয়েছে শিবের বাহন নন্দীর মুর্তি। রয়েছে সুন্দর কারুকার্যমন্ডিত তুলসী মঞ্চ। এই রকম তুলসী মঞ্চ খিড়কির পুকুরের দিকেও নজরে আসে। বিশাল খিড়কি পুকুর, মাছ রয়েছে এখানে, যা অতিথিরা ছিপ ফেলে ধরতে পারেন, কিন্তু মারবার নিয়ম নেই, ফের জলে ছেড়ে দেওয়াই দস্তুর। বাগানে রয়েছে রয়েছে ধানের গোলা, ঢেঁকি। রয়েছে বিশাল দাবার বোর্ডও। পুরোনো গোয়াল হয়েছে চা-ঘর। আর রয়েছে অতিথিদের জন্য আধুনিক সুবিধাযুক্ত মাটির কটেজ।
এই সাবেকিয়ানা, এই রাজকীয়তাকে চলচিত্রে বাস্তবরূপ দেবার জন্য বহু হিন্দি ও বাংলা সিনেমাতেই এই রাজবাড়ীকে ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন লুটেরা, পরান যায় জ্বলিয়া রে, রাজমহল প্রভৃতি। তবে এখন আর রাজবাড়ী সিনেমার জন্য ভাড়া দেওয়া হয় না। কারণ রাজবাড়ীকে সিনেমায় ব্যবহার করার জন্য পরিচালকরা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেন, রঙ করেন, যা এর ঐতিহ্য ও গঠনের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাই বর্তমান বংশধর ধ্রুবনারায়ণ কুণ্ডু যাবতীয় ঐতিহ্য বজায় রেখেই এটিকে হেরিটেজ হোটেলে পরিণত করেছেন। নেদি বাড়ির সাজসজ্জার সঙ্গে ঘরের নামও বেশ অদ্ভুত। মেজদিদি, বড়দিদি, মা, জ্যাঠামশাই, ছোটপিসি বিভিন্ন নাম ঘরগুলোর। চাইলে রাতও কাটাতে পারেন এখানে। ইটাচুনা রাজবাড়ির খাওয়া-দাওয়াও রাজকীয়। ইটাচুনা রাজবাড়ি যেতে গেলে আপনাকে আগে থেকে ঘর বুক করে যেতে হবে। ঘরের ভাড়া ৩,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত। ইটাচুনা রাজবাড়ির অনলাইন ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি ঘর বুক করতে পারবেন। যদি ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চের প্যাকেজ শুরু হয় ৫০০ টাকা থেকে। আর রাতের খাবারেও থাকে এলাহি আয়োজন। পোলাও, মাংস ইত্যাদি। ডিনারের প্যাকেজ শুরু হয় ৩৫০ টাকা থেকে।
এমনকি রসুইঘর আজও তাঁরাই সামলান, যারা বংশপরম্পরায় জমিদার বাড়ির রান্নার দায়িত্বে ছিলেন। বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজিয়ে ফেরে অতিথিদের ঘরের দ্বারে দ্বারে। রাতে গা ছমছমে পরিবেশে পল্লবিত হয় ভূতের গল্প।
নাই বা রইলো রাজপাট, নাই বা হলেন রাজা, জমিদারগৃহে একদিন বাস করে এখানে কদিন রাজা সাজাই যায়। পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য গাইডেড ট্রিপের ব্যবস্থা আছে। বারান্দায় প্রাচীণ আরামকেদারায় হেলান দিয়ে, লাল মেঝেতে রোদের আলপনা আর দেওয়ালে হরেকরকম পুরানো দিনের সাদাকালো ছবি দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। সাবেকী বৈঠকখানা আজো সজ্জিত পুরোনো অস্ত্র, ঝাড়বাতি, শ্বেতপাথরের টেবিল, গড়গড়া, টানা পাখায়। প্রহরে প্রহরে ঢং ঢং ঘন্টার নিনাদ জানান দেয়, নতুন যুগেও ইটাচুনার রাজবাড়ী তৈরী, তার অতিথিদের বরণ করার জন্য।
Comments
Post a Comment