অনাবিল উত্তরবঙ্গ সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা - লাভা, লোলেগাঁও আর রিশপ

গ্রীষ্ম হোক বা বর্ষা, শীত হোক বা বসন্ত, সারা বছরই ভ্রমণ প্রিয় বাঙালি ঘুরতে যেতে ভালোবাস, সে পাহার হোক বা জঙ্গল, নদী হোক বা সমুদ্র, মরুভূমি হোক বা তীর্থ। বাঙালির ভ্রমণ মানচিত্রে মোটামুটি এইসবই রয়েছে। ধন, ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই রাজ্যেই আছে সমুদ্র, পাহাড় আর ঘন জঙ্গল। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি তাই এবার পাহাড়ের টানে ছুটলাম।
পাহাড় বলতেই বাঙালির চোখে ভেসে ওঠে দার্জিলিং, টাইগার হিল আর কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু বর্তমানে দার্জিলিঙে যা টুরিস্টদের ভিড় হচ্ছে শুনলাম ওই দিকটা কে পাস কাটাতে বাধ্য হলাম। তাই ঠিক করলাম কোলাহলমুক্ত কোন অফবিট জায়গায় আমরা যাব। অনেক Internet search করে, অবশেষে খুঁজে পেলাম। উত্তরবঙ্গের খুবই জনপ্রিয় অফবিট জায়গা - রিশপ, লাভা, লোলেগাঁও।

কোথায় অবস্থিত?
রিশপ… এটি পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলায় অবস্থিত ছোট্ট একটি পাহাড়ী গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫৯১ মিটার অর্থাৎ প্রায় ৮৫০০ feet উচ্চতায় অবস্থিত। এটি নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্গত।

কিভাবে যাবেন?
প্রথমে আপনাকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন অথবা শিলিগুড়ি অথবা বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছতে হবে। তারপর সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করতে হবে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। মূলত লাভা, লোলেগাঁও আর রিশপ এই তিনটি জায়গাই একে অপরের কাছে পিঠেই অবস্থিত। সাধারণত দুটি উপায়ে রিশপে পৌঁছানো যায়। একটি হল কালিম্পং হয়ে, আরেকটি হল গরুবাথান হয়ে। কিন্তু আমি পরামর্শ দেব যদি সম্ভব হয় আপনারা গরুবাথান হয়েই রিশপে যান। এই রুটটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক কথায় অভূতপূর্ব।

আমরা উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে করে নিউ ময়নাগুরি স্টেশনে নেমেছিলাম, যেটি ডুয়ার্স ভ্রমনের জন্য বিখ্যাত। নিউ ময়নাগুরি স্টেশনটি NJP স্টেশন থেকে মোটামুটি 45 km দূরে অবস্থিত। এই স্টেশনটি NJP স্টেশনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে স্টেশনের বাইরে কোন গাড়ির মেলা নেই। যাত্রী বলতেও শুধু আমরাই ছিলাম। অদ্ভুত একটি নিস্তব্ধতা অনুভব করছিলাম। এবারে আমাদের ভাগ্য এতটাই সুপ্রসন্ন ছিল যে, NJP স্টেশন থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন পেয়ে যাই। আমাদের এই যাত্রা পথের সঙ্গী ছিল সুন্দর ডুয়ার্সের জঙ্গল আর চা বাগান।

 যাত্রা পথের মাঝখানে একটু বিরতির জন্য আমরা নেমেছিলাম পাহাড়ি রেলি নদীর সামনে। সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে আর হাল্কা করে পেট পুজো করে আবার রওনা দিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই আমরা পৌঁছালাম লাভা। এখানে রাস্তার উপরেই রয়েছে লাভা মনেস্ট্রি। যদিও আমরা সেই দিন আর নেমে দেখিনি, কিন্তু আপনারা চাইলে নেমে দেখতে পারেন। লাভা থেকে রিশপের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। তবে লাভা থেকে রিশপে যাওয়ার রাস্তাটি খুবই মনোরম। কিন্তু খুবই দুর্গম এবং খাড়াই। রাস্তাটি ঘন পাইনের জঙ্গল দ্বারা বেষ্টিত। এখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছোয় না বললেই চলে।

কোথায় থাকবেন?
এখানে থাকার জন্য বর্তমানে প্রচুর হোমস্টে রয়েছে। সবগুলোই কমবেশি ভালো। আপনারা চাইলে যেকোনো একটি বুক করে নিতে পারেন। সমস্ত হোমস্টে থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। তবে আমরা ছিলাম কাঞ্চন ভিউ হোমস্টেতে। এই হোমস্টেটি অন্য হোমস্টের গুলোর তুলনায় একটু বেশিই ভালো। কারণ এই হোমস্টে টির সামনে কোনরকম বাধা ছিল না কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য। তাই আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা কে মন ভরে উপভোগ করতে পেরেছি।

কোথায় কোথায় যাবেন এবং কি কি দেখবেন?
রিশপকে কেন্দ্র করে আপনারা অনেকগুলি টুরিস্ট ডেস্টিনেশন কভার করতে পারবেন। তবে তার জন্য আপনাকে হাতে সময় নিয়ে আসতে হবে। এখান থেকে আপনারা ঘুরে নিতে পারবেন সম্পূর্ণ কালিম্পং শহরটিকে, যার মধ্যে আপনারা দেখে নিতে পারবেন ডেলো পার্ক, সাইন্স মিউজিয়াম, মরগ্যান হাউস, Golf কোর্স এবং আরো বেশ কিছু জায়গা। আরেকদিন ঘুরে দেখে নিন লাভা এবং লোলেগাঁও ছোট্ট দুটি গ্রাম, যার মধ্যে রয়েছে লাভা মনেস্ট্রি এবং আরো বেশ কিছু জায়গা। তবে আপনারা চাইলে রিশপ থেকে ট্রেকিং করেও লাভায় যেতে পারেন।
ট্রেকিং যদি আপনার নেশা হয় তাহলে কোন একদিন সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়ুন টিফিন দারার উদ্দেশ্যে। এই পথটি সম্পূর্ণ ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, তাই কখনওই একা যাবেন না, সঙ্গে কাউকে নিয়ে নিন। এই জঙ্গলে প্রচুর লেপার্ড রয়েছে। তবে যদি আপনি কষ্ট করে টিফিন দারায় পৌঁছতে পারেন, তখন প্রকৃতির মনমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে আপনার সমস্ত কষ্ট নির্মূল হয়ে যাবে। এখান থেকে সম্পূর্ণভাবে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ দেখতে পাওয়া যায়। আর তার সাথে রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোরম দৃশ্য। এইখান থেকে আপনি সূর্যদয়ও দারুন ভাবে উপভোগ করতে পারবেন।
আর একটা দিন ঘুরে দেখে নিন কোলাখাম গ্রামটিকে। যেখানে রয়েছে ছাঙ্গি ফলস। তবে এই ফলসটিকে যদি আপনি দেখতে চান তাহলে আপনাকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের একটি ছোট্ট ট্রেক করতে হবে। এটি প্রধান রাস্তা থেকে অনেকটাই নিচে অবস্থিত এবং যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। আপনাকে পাথরের উপর দিয়ে নিচে নেমে যেতে হবে। বয়স্ক এবং যাদের শারীরিক কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাদের কখনোই এইখানে যাওয়া উচিত নয়।

এখানে আসার সঠিক সময়
বর্ষাকাল ছাড়া আপনি বছরের যেকোনো সময়ই এখানে আসতে পারেন। তবে আমি উপদেশ দেবো, যদি প্রকৃতিকে নিজের মনের মত করে উপভোগ করতে হয় এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে হয় তাহলে অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মিডিল পর্যন্ত হচ্ছে সবচেয়ে সঠিক সময় এখানে আসার।

তাহলে বন্ধুরা, আর দেরি কেন? এখনি বেরিয়ে পর এই অজানা পাহাড়ি গ্রামটিকে নিজের চোখে চিনে নিতে ও জানতে।

Comments